রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড: বুক রিভিউ

রিচ ড্যাও পুওর ড্যাড বই এর বুক রিভিউ:

পুরো বইতে রবার্ট কিওসাকি মূলত তাঁর নিজের বাবা (পুওর ড্যাড) ও তাঁর বন্ধু মাইক এর বাবা (রিচ ড্যাড) এর দুই ধরনের চিন্তা ও কাজ কারবারকে তুলনা করেছেন।

পুওর ড্যাড দারুন শিক্ষিত ও সম্মানিত একজন মানুষ হলেও, তিনি আসলে মধ্যবিত্ত চিন্তায় আটকে ছিলেন। অন্যদিকে রিচ ড্যাড ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের মত করে চিন্তা করতে পারতেন।  তিনি ঝুঁকি নিতে ভয় পেতেন না।

রিচ ড্যাড যখন রবার্টকে শিক্ষা দেয়া শুরু করেন, তিনি কিন্তু তখন ধনী ছিলেন না।  একটি ভা‌ঙাচোরা বাড়িতে, স্ত্রী আর ছেলেকে নিয়ে তিনি থাকতেন।  তখন তিনি কেবল তাঁর কাজ শুরু করেছিলেন।

এই কারণে রবার্ট ও মাইক রিচ ড্যাডের ধনী হওয়ার পুরো প্রক্রিয়া চোখের সামনে দেখেছিলেন, সেই সাথে রিচ ড্যাড প্রায়ই দুই ছেলেকে ধনী হওয়ার বিষয়ে লেকচার দিতেন।  তিনি বলতেন, স্কুল কলেজের শিক্ষা অবশ্যই দরকার আছে।  এই শিক্ষা মানুষের চিন্তা ভাবনাকে শক্তিশালী করে, কিন্তু এর সাথে আর্থিক শিক্ষাও দরকার।  সত্যিকার আর্থিক শিক্ষা না থাকলে একজন মানুষ সারাজীবন অন্যের চাকর হয়ে কাটাবে। তার জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অন্য মানুষ ধনী হবে, কিন্তু সে নিজে ধনী হতে পারবে না।

রিচ ড্যাডের মত পুওর ড্যাডও রবার্ট কিওসাকিকে জীবনে বড় হওয়ার বিষয়ে লেকচার দিতেন।  সেসব ছিলো ভালো শিক্ষা অর্জন করে একটি নিরাপদ চাকরি পাওয়ার বিষয়ে।  পুওর ড্যাড ছেলের সাথে টাকা পয়সা বিষয়ে আলোচনা করতে চাইতেন না।  অন্যদিকে রিচ ড্যাড ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের টাকা পয়সার বিষয়ে সচেতন করার পক্ষে ছিলেন।

এই দুইজন বাবার স্বভাব চরিত্র নিয়ে বইয়ের পুরো একটা চ্যাপ্টারই আছে।  চলুন আগে সেই চ্যাপ্টার অনুসারে দুই বাবার চিন্তার ধরণ আরেকটু ভালো করে জানি।

পুওর ড্যাড (গরিব বাবা):

গরিব বলতে যা বোঝায়, পুওর ড্যাড সেই অর্থে গরিব ছিলেন না।  তিনি একটি সরকারি চাকরি করতেন, এবং তাঁর মাসিক আয় যথেষ্ঠ ভালো ছিল।  কিন্তু তিনি তাঁর মধ্যবিত্ত মানসিকতার কারণে, সেই টাকা কাজে লাগিয়ে বড় কিছু করতে পারেননি।  সারাটা জীবন তাঁর টাকা নিয়ে টেনশন করেই কেটেছে।

এই চরিত্রটি আসলে সেইসব কোটি কোটি বাবার চরিত্র, যাঁরা নিজের সন্তানকে ভালোমত পড়াশুনা করে একটি ভালো চাকরি করতে উ‌ৎসাহ দেন।

পুওর ড্যাড এর চাওয়া ছিল, রবার্ট যেন ভালোমত পড়াশুনা শেষ করে একটি ভালো কোম্পানীতে বা সরকারের হয়ে কাজ করেন।   রবার্ট যখন একটি ভালো কোম্পানীর মোটা বেতনের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসায় নামলেন, তখন পুওর ড্যাড খুবই হতাশ হয়েছিলেন।

পুওর ড্যাড শিক্ষাকে দেখতেন সফল হওয়ার টিকেট হিসেবে। তাঁর একটি ডক্টরেট ডিগ্রী ছিল, এবং তিনি সব সময়ে বলতেন, “টাকার ব্যাপারে আমার কোনও আগ্রহ নেই”, “টাকা কোনও জরুরী জিনিস নয়”।   তিনি আরও বলতেন, “পৃথিবীর সব খারাপের মূলে আছে টাকা”।

কিন্তু সত্যি কথা বলতে, তিনি সারাটা জীবন টাকার জন্যই কষ্ট করেছেন, কিন্তু কোনওদিনই যথেষ্ঠ টাকা হাতে রাখতে পারেননি।

রিচ ড্যাড (ধনী বাবা):

লেখক তাঁর বই এর ভেতরে লিখেছেন, ৯ বছর বয়সেই তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর নিজের বাবার চেয়ে রিচ ড্যাডের কথাগুলো অনেক বেশি সঠিক।

পুওর ড্যাড কোনওকিছু দিতে না পারলে বলতেন, “আমার পক্ষে এটা দেয়া সম্ভব না”; আর রিচ ড্যাড বলতেন, “এটা দেয়ার জন্য কি করা যায়?”।  রিচ ড্যাড ছিলেন আশাবাদী ও সাহসী একজন মানুষ। 

রিচ ড্যাড বিশ্বাস করতেন, যদি একজন মানুষ চাকরিও করে, তবুও সে যেন নিজের জন্যই কাজ করে।   তাহলেই সে উন্নতি করতে পারবে।  চাকরিকে শুধু টাকা কামানোর উপায় হিসেবে না দেখে, কাজ শেখার জায়গা হিসেবে দেখতে হবে।  তাহলেই সে সত্যিকার কাজ শিখতে পারবে, এবং পরে সেই দক্ষতা নিজের কাজে লাগাতে পারবে।

দামী কোনওকিছু দরকার হলে নিজেকে বলা যাবে না যে, “আমি এটা কিনতে পারবো না” ।  তার বদলে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, “এটা কিনতে হলে আমাকে কি করতে হবে?”

তিনি বলতেন, ধনী হতে হলে প্রথমেই সাহসী আর আশাবাদী হতে হবে।  তোমার লক্ষ্য থাকবে, টাকার জন্য যেন অন্য কোনও মানুষের ওপর তোমাকে নির্ভর করতে না হয়।

নিজেকে এমন ভাবে গড়তে হবে, যেন টাকার জন্য মানুষ তোমার ওপর নির্ভর করে।  নিজের পকেটে অল্প টাকা ভরে অন্যের পকেটে অনেক টাকা ভরার বদলে, অন্যের পকেটে অল্প টাকা দিয়ে নিজের পকেটে বেশি টাকা রাখার চেষ্টা করতে হবে।  পুঁজিবাদ খারাপ কিছু নয়, যাদের নিজের চেষ্টায় কিছু করার যোগ্যতা নেই, তারাই পুঁজিবাদকে খারাপ বলে।  চাইলে যে কেউ পুঁজিবাদকে কাজে লাগিয়ে বড়লোক হতে পারে।  কিন্তু সেই কষ্টটা বেশিরভাগ মানুষ করতে চায় না।  আর এইসব স্কুল কলেজেও শেখানো হয় না।

তাঁর মতে, গরীবরা সারাজীবন গরীব থেকে যাওয়ার একটি বড় কারণ হলো, তারা সব সময়ে টাকার জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করে।  তারা বিশ্বাস করে ধনীর টাকায় তাদের অধিকার আছে; এবং যাদের বেশি টাকা, তাদের উচি‌ৎ সেই টাকা থেকে গরিবদের সাহায্য করা।  যদিও এটা ধনীদের দায়িত্ব।  কিন্তু এই চিন্তার কারণে গরিবরা নিজের চেষ্টায় ধনী হওয়ার কথা ভাবে না।  তাই কাজও করে না, ধনীও হয় না।

তিনি বলতেন “টাকার অভাবই হলো পৃথিবীর সব খারাপের মূল”। 

৬টি মূল লিসন বা শিক্ষা:

পুরো বইটিতে গরিব ও মধ্যবিত্ত মানসিকতা থেকে বের হয়ে ধনী মানসিকতা তৈরীর জন্য মোট ৬টি লিসন বা শিক্ষা দেয়া হয়েছে।

লিসনগুলো হলো:

০১. ধনীরা টাকার জন্য খাটে না, টাকা তাদের জন্য খাটে

০২. আর্থিক শিক্ষা কেন প্রয়োজন

০৩. নিজের ব্যবসা নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে

০৪. ট্যাক্স এবং কর্পোরেশনের ব্যবহার

০৫. ধনীরা কিভাবে টাকার জন্ম দেয়

০৬. টাকার জন্য কাজ করার বদলে শেখার জন্য কাজ করা কেন প্রয়োজন

এই ৬টি লেসন লেখক মোট ১০টি চ্যাপ্টার বা অধ্যায়ে দিয়েছেন।  চলুন এই বই এর মূল বিষয় ও শিক্ষাগুলো সারাংশ আকারে দেখি:

যেভাবে শুরু হলো:

বইয়ের শুরুতে রবার্ট কিওসাকি গল্পের মত করে দুই বাবার মধ্যে পার্থক্য দেখিয়েছেন। দুই বাবার মধ্যে যে তুলনা আমরা এই লেখার প্রথমে দিয়েছি – সেটাই আসলে প্রথম অধ্যায়ের বিষয়বস্তু।  তবে গল্পটা কিভাবে শুরু হলো, সে বিষয়ে একটু ধারণা নিয়ে নেয়া যাক:

রবার্ট কিওসাকি ও তাঁর বন্ধু মাইক যখন স্কুলে পড়তেন, তখন দেখতেন, তাঁদের সহপাঠীদের পোশাক আশাক, নতুন সাইকেল, গাড়ি – ইত্যাদি সবই ধনীদের মত।  তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, ধনী হতে গেলে অনেক টাকা দরকার।

রবার্ট তাঁর নিজের বাবা, অর্থা‌ৎ পুওর ড্যাডকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “কিভাবে টাকা বানানো যায়?” – রবার্টের বাবা জনাব কিওসাকি সিনিয়র, এই কথা মাইকের বাবাকে জিজ্ঞেস করতে বলেছিলেন।  কারণ তিনি জানতে পেরেছিলেন, যদিও মাইকের বাবা মানে আমাদের ‘রিচ ড্যাড’ তখনও অতটা বড়লোক হননি, কিন্তু তাঁর কাজ কারবারে বোঝা যাচ্ছিল তিনি এক সময়ে সেই অঞ্চলের সেরা ধনী হতে চলেছেন (এবং তা তিনি হয়েছিলেন)।

রিচ ড্যাড

৯ বছরের বালক মাইক ও রবার্ট মিলে মাইকের বাবার সাথে দেখা করে তাদের ধনী হওয়ার ইচ্ছার কথা জানায়, রিচ ড্যাড নিজের ছেলে মাইক, ও ছেলের বেস্ট ফ্রেন্ড রবার্টকে শেখাতে শুরু করেন।  এবং তখন থেকে রবার্ট কিওসাকি তাঁর বাবা মি.কিওসাকি সিনিয়রের সাথে রিচ ড্যাডের পার্থক্যগুলো বুঝতে শুরু করেন।  সেই সাথে বুঝতে শুরু করেন ধনী মানুষ আর সাধারণ মানুষের কাজ ও চিন্তা করার ধরন অনেক আলাদা। 

লিসন ০১: “ধনীরা টাকার জন্য খাটে না, টাকা তাদের জন্য খাটে”

এই অধ্যায়েই মূলত লেখকের শিক্ষা শুরু হয়েছিল।  রবার্ট ও তাঁর বন্ধু মাইককে রিচ ড্যাড তাঁর সুপার শপে কাজ করতে দেন।  তাঁদের পেমেন্ট ছিল খুবই কম।  কয়েকদিন কাজ করার পর রবার্ট ও মাইক বুঝতে পারে তাদের খাটনির তুলনায় রিচ ড্যাড খুবই কম টাকা দিচ্ছেন।

এটা নিয়ে তাদের বেশ মন খারাপ হয়, এবং তারা রিচ ড্যাডকে এই কথা বলে।  শিশু রবার্ট কিওসাকি এবং মাইক আসলে বুঝতে পারেননি যে, তাঁদের একটি মূল্যবান শিক্ষা দেয়ার জন্য রিচ ড্যাড এমনটা করেছিলেন।  রিচ ড্যাড তাদের দুইজনকে দু’টি অফার দেন।  হয় তাঁরা ১০ ডলার-প্রতি ঘন্টায় চাকরি করবে, আর নাহয়, তাঁর জন্য ফ্রি কাজ করবে।

তবে তিনি সতর্ক করে দেন যে এখন যদি ১০ ডলার-প্রতি ঘন্টায় তারা কাজ করে, তবে তারা সারা জীবন অন্যের জন্য খাটবে।  আর যদি তারা নিজেদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে পারে, তবে তারা একদিন বহু লোককে খাটাতে পারবে

৯ বছরের দু’টি ছেলের কাছে সেই সময়ে ১০ ডলার মানে বিশাল ব্যাপার।  কিন্তু রবার্ট ও মাইক এর ভেতরে লুকানো শিক্ষাটা বুঝতে পারে এবং ফ্রিতে কাজ করবে বলে ঠিক করে। 

পরে রিচ ড্যাড তাদের বোঝান যে, মানুষ দুই ভাবে বাঁচতে পারে।  এক, জীবন তাদের যেভাবে যেদিকে নিয়ে যাবে – সেদিকে চলে; দুই, নিজের পথ নিজে করে নিয়ে।

জীবন সব সময়েই মানুষকে নিয়ে খেলবে।  কিন্তু কিছু মানুষ এই খেলাটা ধরার চেষ্টা করে, এবং নিজে কোন দিকে যাবে – সেই সিদ্ধান্ত নিজেই নেয়।

গরীব ও মধ্যবিত্তরা কাজ করে লোভ আর ভয় থেকে।  অন্যদিকে ধনীরা এই দু’টোকে জয় করে।  তারা অনেক দূরের চিন্তা করতে পারে।  একটা ভালো বেতনের চাকরি হলেই যেখানে গরীব আর মধ্যবিত্তরা মহা খুশি হয়; ভবিষ্যতে যে লোকটি ধনী হবে, সে এতটা খুশি হয় না।

যার মধ্যে ধনী হওয়ার গুণ আছে, সে অনেক ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়।  একটি কাজ করার ফলে দীর্ঘমেয়াদে তার জীবনে কি প্রভাব পড়বে – তা সে ভেবে দেখে। 

যে লোকটি গরিব আর মধ্যবিত্ত হয়ে জীবন কাটাবে, সে বেশিরভাগ সময়ে নিরাপত্তা খোঁজে। অন্য দিকে যে লোকটি ধনী হয়ে জীবন কাটাবে, সে সব সময়ে সুযোগ খোঁজে। 

গরিব আর মধ্যবিত্তরা বড় কোনও সুযোগ সামনে আসলে যখন ঝুঁকি নেয়ার ভয়ে পিছিয়ে যায়, ধনীরা বা ভবিষ্যতে যারা ধনী হবে – এমন মানুষেরা সেইসব সুযোগকে কাজে লাগায়।

গরিব আর মধ্যবিত্তরা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে সামনে পড়ে থাকা সুযোগকেও অনেক সময়ে দেখতে পায় না।

যার মধ্যে ধনী হওয়ার মানসিকতা আছে, সে সব সময়ে চেষ্টা করে কিভাবে টাকার জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করা বন্ধ করা যায়।  তারা সব সময়ে বিনিয়োগের সুযোগ খোঁজে, যাতে করে টাকা তাদের জন্য কাজ করে।  টাকার জন্য যেন তাদের খাটতে না হয়। 

যে মানুষটি সত্যিই ধনী হতে চায়, সে সব সময়েই সুযোগ খোঁজে এমন কিছু করার, যা তার ঘুমের মধ্যেও তার জন্য টাকা আয় করবে।   ইংরেজীতে একে বলে “Passive income” – লেখক বই তে বহুবার এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

একজন মানুষের মানসিকতাই যদি হয়, একটি ভালো চাকরি করে স্বচ্ছল জীবনযাপন করা, এবং চাকরির শেষে ভালো একটি পেনশন পাওয়া – তারা কখনওই সত্যিকার অর্থে ধনী হতে পারবে না।

টাকা যদি আপনার জন্য না খাটে, অর্থা‌ৎ টাকা দিয়ে যদি টাকা আয় না হয় – তবে আপনার হাতে যতই জমানো টাকা থাক, আর ভালো চাকরি থাক, অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ভয় সব সময়ে আপনার ঘুম হারাম করবে। 

কাজেই, প্রথম লিসন হচ্ছে, টাকার জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকার মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসা।  এমন একটি মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে, যাতে করে আপনার মন সব সময়েই বিনিয়োগের সুযোগ খোঁজে।  যে বিনিয়োগের ফলে আপনি ঘুমিয়ে থাকলেও সেই টাকা আপনার জন্য আরও টাকার সৃষ্টি করবে।

লিসন: ০২. আর্থিক শিক্ষা কেন প্রয়োজন

মধ্যবিত্ত পরিবার গুলোতে ছেলেমেয়ের সামনে টাকা পয়সা নিয়ে আলোচনা করা হয় না।  তারা টাকা পয়সার বিষয়ে কোনও মন্তব্য বা প্রশ্ন করলে তাদের জবাব দেয়া হয়, “তোমাকে এসব নিয়ে ভাবতে হবে না, তুমি পড়াশুনায় মনোযোগ দাও/খেলতে যাও”

আর দরিদ্র পরিবার গুলোতে ছেলেমেয়ের সামনে শুধু টাকা পয়সার অভাব নিয়েই কথা হয়। গঠন মূলক কথা বলা হয় না।

শুধুমাত্র অভিভাবকদের এইসব আচরণের কারণে ছেলেমেয়রা বাস্তব জীবনে গিয়ে দারুন বিপদে পড়ে।

সেইসব ছেলেমেয়েই বাবা-মা’র টাকা নষ্ট করে বা উড়িয়ে দেয়, যারা টাকার মর্ম বোঝে না।  আর এই না বোঝার জন্য তাদের বাবা-মায়েরাই দায়ী।

রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড বই, বুক রিভিউ

বাবা-মা, বা স্কুল এই বিষয়ে তাদের কিছুই শেখায় না, তাই তারা টাকা পয়সার গুরুত্ব বোঝে না, টাকা পয়সা কিভাবে ম্যানেজ করতে হয় – সেটাও বোঝে না।  এবং এই কারণে তারা সারাটা জীবন টাকা পয়সা নিয়ে ঝামেলায় থাকে।

হয়তো তারা ভালো বেতনের চাকরি করে, কিন্তু কিছু বেসিক মানি ম্যানেজমেন্ট না জানার কারণে তারা সেই টাকা ঠিকমত কাজে লাগাতে পারে না, এবং সেই কারণে সত্যিকার ধনী হতে পারে না।

এমন বহু মানুষই আছেন, যাঁরা সারা জীবনে অনেক টাকা আয় করেছেন, কিন্তু শেষ জীবনে টাকার অভাবে পড়েছেন।  এর একটি প্রধান কারণই হচ্ছে তাঁদের আর্থিক শিক্ষার অভাব।

অন্যদিকে ধনী বাবা’মায়েরা অল্প করে হলেও ছেলেমেয়েদের টাকা পয়সার বিষয়ে সচেতন করে তোলেন।  বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা তাঁদের সন্তানদের টাকা পয়সার বিষয়ে সচেতন করে তোলেন, কারণ তাঁদের মাথায় থাকে যে এই ব্যবসা একদিন তাঁর সন্তানকেই সামলাতে হবে।

রিচ ড্যাড, অর্থা‌ৎ মাইক এর বাবা এমনিতেই নিজের ছেলেকে এসব বিষয় শিক্ষা দিতে চাচ্ছিলেন – রবার্ট কিওসাকি’র সৌভাগ্য যে তিনি এই শিক্ষায় শামিল হতে পেরেছিলেন। 

মাইক বর্তমানে তাঁর বাবার বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য খুব ভালোভাবেই সামলাচ্ছেন।  রিচ ড্যাড তাঁর কোম্পানীকে যে অবস্থায় রেখে গিয়েছিলেন, মাইকের হাতে সেই অবস্থার আরও উন্নতি হয়েছে।  রবার্ট এই অধ্যায়ে লিখেছেন যে, মাইক এখন তাঁর বাবার মত করেই তাঁর নিজের ছেলেকে ব্যবসা শেখাচ্ছেন।

রবার্ট কিওসাকি তো আজ নিজের চেষ্টায় বিশাল সম্পদের মালিক।  বর্তমানে দারুন আয়েশী জীবনযাপন করেন তিনি।  ঘরে বসে থেকেই তাঁর মাসে প্রায় মিলিয়ন ডলার আয় হয়। 

সত্যিকার সম্পদ ও দায়:

কিওসাকি লিখেছেন, সাধারণ মানুষ যেভাবে সম্পদ ও দায় কে বিচার করে, ধনীরা তেমনটা করে না।  এই শিক্ষা কোনও বইতে দেয়া হয় না।  একজন শিক্ষিত চার্টার্ড এ্যাকাউনটেন্টও অনেক সত্যিকার সম্পদকে দায় এবং সত্যিকার দায়কে সম্পদ হিসেবে দেখেন।  কারণ, বইগুলোতে এভাবেই লেখা আছে। 

কিন্তু বাস্তব জীবনে বইয়ের অনেক কথাই ভুল প্রমাণ হয়।  সাধারণ হিসাব বিজ্ঞানে, একজন মানুষের অফিসে বা বাড়িতে যদি দামী শো-পিস থাকে, তাকে সম্পদ হিসেবে ধরা হয়।  কিন্তু সত্যি কথা বলতে এটা এক ধরনের দায়।

মার্বেল পাথরের একটি মূর্তি আপনি যত টাকা দিয়ে বানাবেন, বেচতে গেলে তার অর্ধেকও পাবেন না।  যদি সেটা এ্যান্টিক ধরনের কিছু হয়, তবে আলাদা কথা।  কিন্তু শখের জিনিস কখনও সম্পদ হতে পারে না।  কিন্তু হিসাব বিজ্ঞানের ভাষায় এগুলোও সম্পদ।  আসলে এগুলো শুধু জায়গা দখল করে রাখছে।  এর থেকে কোনও আয় হচ্ছে না।

অন্যদিকে আপনার যদি একটি ব্যক্তিগত মিউজিয়াম থাকে, এবং আপনি সেই মিউজিয়ামে বিভিন্ন ধরনের এ্যান্টিক শো পিস, মূর্তি ইত্যাদি রাখেন – এবং লোকজন টাকা দিয়ে টিকিট কেটে সেগুলো দেখে – তাহলে সেগুলো অবশ্যই আপনার সম্পদ।

তার মানে, যেসব জিনিস আপনার জন্য আয় করে, সেগুলোই শুধুমাত্র সম্পদ, অন্য সবকিছু দায় অথবা খরচ। 

এই অধ্যায়ে কিওসাকি সত্যিকার সম্পদ ও দায় বুঝতে পারার দক্ষতার ওপর জোর দিয়েছেন।  একজন মানুষ যদি সত্যিকার ব্যবসায়ীর মত করে সম্পদ আর দায়কে আলাদা করতে না পারেন, তবে তিনি সেগুলো ব্যবহার করে ধনী হতে পারবেন না।

কিওসাকি লিখেছেন, এমন অনেক খেলোয়াড়, লটারী বিজয়ী, শিল্পী, চাকুরে আছেন যারা নিজের পেশা থেকে বহু অর্থ আয় করার পরও সেই টাকা দিয়ে কিছু করতে পারেননি।  অনেকে টাকা পাওয়ার আগে যতটা গরিব ছিলেন, টাকা পাওয়ার পর আরও গরিব হয়ে যান।

এর প্রধান কারণ, তাঁরা টাকাকে কিভাবে কাজে লাগাতে হয় – সে বিষয়ে কিছুই জানেন না।  লেখকের মতে, আর্থিক জ্ঞান ছাড়া টাকা হলো দ্রুত উড়ে যাওয়া টাকার আরেক নাম।  টাকাকে কিভাবে কাজে লাগালে সেই টাকা আরও টাকা নিয়ে আসবে – এই বিষয়ে জ্ঞান থাকাটা ধনী হওয়ার জন্য অপরিহার্য।  এই শিক্ষা পড়াশুনার পাশাপাশি নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেও অর্জন করা যায়।

বাবা-মায়েরা যদি নিজেদের টাকা পয়সা কিভাবে আসছে, এবং তা নিয়ে তাঁরা কি পরিকল্পনা করছেন – তার কিছুটাও ছেলেমেয়ের সাথে শেয়ার করেন, তবে তারা টাকার বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠবে।

সঠিক আর্থিক শিক্ষার ফলে মানুষ বাজে খরচ করা থেকে বিরত থাকে।  শুধুমাত্র লোক দেখানোর জন্য তারা হাজার ডলারের আইফোন কেনার বদলে ২০০ ডলারের এ্যান্ড্রয়েড ফোন কেনে।

ওয়ারেন বাফেট ২০১৩ সালেও নোকিয়ার একটি ফোল্ডিং সেট ব্যবহার করতেন, কারণ দামি সেট কিনতে গেলে এই ফোনটি ফেলে দিতে হবে – এবং তাতে অর্থের অপচয় হবে। যদিও কিওসাকি তাঁর বইতে বাফেটের এই ঘটনা বলেননি – তবে ধনী মানুষদের যে মানসিকতা তিনি বইতে বর্ণনা করেছেন – তার সাথে এটি মিলে যায়। 

ধনী মানুষরা ধনী হওয়ার আগ পর্যন্ত বাজে খরচ করেন না।  যদি কোনও বিলাসী বা শখের জিনিস কেনার ইচ্ছা হয় – তবে তাঁরা অপেক্ষা করেন।  আলাদা একটি বাজেট করে তাঁরা টাকা জমাতে বা আয় করতে শুরু করেন।  অন্য খরচের জন্য রাখা টাকা, বা বিনিয়োগের জন্য রাখা টাকা থেকে কখনও তাঁরা বিলাসী জিনিস কেনেন না।  শখ মেটাতে হলে তার জন্যও একটা আলাদা বাজেট থাকে।  এই কারণে তাঁদের কখনও টাকার টান পড়ে না।

এই ধরনের মানসিকতা সৃষ্টির জন্য আর্থিক শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।  সেই সাথে অন্য কেউ যেন আপনার টাকা মেরে দিতে না পারে, এবং ভুল বুঝিয়ে টাকা নষ্ট না করতে পারে – সেই জন্যও আর্থিক জ্ঞান থাকাটা জরুরী।

এই অধ্যায়ে ট্যাক্স, মার্কেটিং, এ্যাকাউন্টিং, বানিজ্যিক আইন – ইত্যাদি বিষয়ে যতটা পারা যায় জেনে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, লেখক রবার্ট কিওসাকি।

লিসন: ০৩. নিজের ব্যবসা নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে

মানুষ টাকা আয়ের জন্য দুই ধরনের কাজ করে, চাকরি আর ব্যবসা।  চাকরি মানে অন্যের জন্য খাটা, আর ব্যবসা মানে নিজের জন্য খাটা।

সাধারণ ভাবে মনে হয় ব্যবসার থেকে চাকরিতে ঝুঁকি কম।  কিন্তু সত্যি কথা বলতে চাকরির ঝুঁকি অনেক বেশি।  আপনি যদি শুধু একটি চাকরির ওপরই আর্থিক ভাবে নির্ভরশীল হন, তবে আপনি সব সময়েই একটা ভয়ের মাঝে থাকবেন।

চাকরি চলে গেলেই আপনি বিপদে পড়বেন।  হাতে যদি জমানো টাকা থাকে, তা-ও এক সময়ে শেষ হয়ে যাবে।  কাজেই শুধু টাকা জমালেই নির্ভয় হওয়া যায় না। 

অন্য দিকে আপনার যদি একাধিক জায়গায় বিনিয়োগ থাকে, যেখান থেকে নিয়মিত আপনার আয় হচ্ছে, তখন আপনি নির্ভয়ে আপনার যেটা ভালো লাগে সেটা করে যেতে পারবেন।  আপনি যদি চাকরিও করেন, তাহলেও চাকরির কাজটি অনেক শান্তিতে করতে পারবেন।  ভয় থেকে নয়, কাজের আনন্দের জন্য কাজ করতে পারবেন।

আপনি যে চাকরিই করেন না কেন, সব সময়ে সেই বেতন থেকে কিছু টাকা আলাদা করে রাখবেন।  এবং ভালো একটি অংকের টাকা জমা হলে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজবেন। 

এছাড়াও আপনার যদি এমন কোনও যোগ্যতা থাকে, যা দিয়ে আপনি এমন কিছু বানাতে পারেন, যা আপনার জন্য অর্থ আয় করবে – তবে চাকরির পাশাপাশি সেইদিকেও মনোযোগ দিন।

লেখকের মতে, রিয়েল এস্টেট, বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, স্টক, সৃষ্টিশীল কাজের রয়্যালিটি (লেখা, গান – ইত্যাদি) – এগুলো একজন চাকরিজীবির জন্য ভালো বিনিয়োগ হতে পারে। 

একজন মানুষ যদি চাকরির কাজটি ভালোমত করে যাওয়ার পাশাপাশি নিজের ব্যবসা নিয়েও মাথা ঘামায়, তবে একটা সময়ে গিয়ে সে অবশ্যই আর্থিক ভাবে স্বাধীন হতে পারবে।  অর্থা‌ৎ, টাকার জন্য আর অন্যের ওপর তার নির্ভর করতে হবে না।  ধনী হওয়ার প্রথম চিহ্ন আসলে এটাই। 

বেশিরভাগ গরিব ও মধ্যবিত্ত মনে করে, সুযোগ পেলে তারাও বড়লোক হতে পারবে।  কিন্তু সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে জীবন পার হয়ে যায়।  সুযোগ যে তাদের সামনেই আছে – তা তারা বুঝতেও পারে না।

লিসন০৪:  ট্যাক্স এবং কর্পোরেশনের ব্যবহার

গরিব ও মধ্যবিত্তরা যখন ট্যাক্স ও অন্যান্য আর্থিক নিয়মের কারণে বিপদে পড়ে, ধনীরা সেই নিয়মকেই কাজে লাগিয়ে নিজেদের সম্পদকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

ধনীদের সাথে গরিব ও মধ্যবিত্তদের একটি বড় পার্থক্য হলো, ধনীরা প্রথম থেকেই নিজের সবকিছুর দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেয়।  তারা অন্যকে দোষ দেয়ার বদলে নিজের সমস্যা নিজে সমাধান করার চেষ্টা করে।

ইনকাম ট্যাক্স বেশি হলে মধ্যবিত্তরা যখন সরকারি কর ব্যবস্থা নিয়ে অভিযোগ করে, তখন ধনীরা কিভাবে সেই ব্যবস্থার ফাঁক বের করে নিজের ট্যাক্স কমানো যায় – তা জানার চেষ্টা করে।

রবার্ট কিওসাকি লিখেছেন, রিচ ড্যাড রবিন হুডকে ঘৃণা করতেন।  মধ্যযুগের এই ইংলিশ ‘হিরো’ ধনীদের সম্পদ লুঠ করে গরিবদের বিলিয়ে দিতেন।  তাঁর ধারণা ছিল, রবিন হুড আসলে গরিবদের উপকার করার বদলে ক্ষতি করতো।  মানুষের যখন বিনা কষ্টে পাওয়ার অভ্যাস হয়ে যায়, তখন সে কাজ করতে চায় না।  

যারা সারাজীবন গরিব থেকে যায় – তারা আসলে ভাবে, ধনীদের সম্পদ থেকে তাদের দেয়া উচি‌ৎ।  যদিও ধনীদের এটা করা উচি‌ৎ, কিন্তু গরিবদের এটার আশায় বসে থাকা উচি‌ৎ নয়।

অন্যের সাহায্যের অপেক্ষায় বসে থাকার কারণেই মধ্যবিত্ত আর গরিবরা সারাজীবন গরিব আর মধ্যবিত্ত থেকে যায়। 

একজন মানুষ, যে ভবিষ্যতে ধনী হবে – তার মধ্যে নিজের কাজ নিজে করার, ও নিজের সমস্যার সমাধান নিজে করার অভ্যাস অবশ্যই থাকবে।

একজন ধনী যদি দেখে ট্যাক্স দিতে গিয়ে তার বেশি খরচ হচ্ছে, সে একজন ভালো এ্যাকাউন্টেন্ট অথবা ইনকাম ট্যাক্স উকিলকে ডেকে পরামর্শ চাইবে, সেই সাথে নিজেও বিষয়টি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবে।  এবং এমন একটা উপায় বের করবে, যাতে করে তার ট্যাক্স কম দিতে হয়।

কর্পোরেশনের শক্তি:

রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড বই এর এই অধ্যায়ে রবার্ট কিওসাকি ট্যাক্স ও আইনের হাত থেকে বাঁচতে কর্পোরেশন গড়ার পরামর্শ দিয়েছেন।  কর্পোরেশন হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব একটি সত্ত্বা থাকবে।  অর্থা‌ৎ সরকারের চোখে, সে একজন ব্যক্তির মতই হবে।  তার নিজস্ব সম্পদ ও ট্যাক্স থাকবে।

ব্যক্তিগত কর বা ট্যাক্স ব্যক্তির আয়ের ওপর ধরা হয়।  যেমন আপনার আয় যদি হয় মাসে ৫০,০০০ টাকা, তবে সেই পুরো টাকার ওপর ট্যাক্স ধরা হবে।  অন্যদিকে একটি কর্পোরেশনের ওপর তার সব খরচ বাদ দিয়ে ট্যাক্স ধরা হয়।

যদি একটি কর্পোরেশন বা বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আয় হয় ৫০,০০০ টাকা, এবং খরচ হয় ২০,০০০ টাকা – তবে (৫০-২০) ৩০,০০০ টাকার ওপর ট্যাক্স ধরা হবে। 

ধনীরা এই বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে তাদের ট্যাক্স কমিয়ে নেন।  এছাড়াও আরও অনেক উপায়ে আইন না ভেঙে কম ট্যাক্স দেয়া যায়।  ধনীরা সেই উপায়গুলো কাজে লাগান।

এখানে লেখক ট্যাক্স আইনকে নিজের সুবিধায় ব্যবহার করার পাশাপাশি, ধনী আর সাধারণ মানুষের দায়িত্ব নেয়ার মানসিকতায় পার্থক্য তুলে ধরেছেন।  সাধারণ মানুষ যেখানে অভিযোগ করে, ধনীরা সেখানে সুযোগ খুঁজে বের করেন।

লিসন ০৫: ধনীরা কিভাবে টাকা সৃষ্টি করে

লেখকের মতে, প্রতিটি মানুষ কোনও না কোনও প্রতিভা নিয়ে জন্মায়।  কিন্তু আত্মবিশ্বাসের অভাব আর আর ভয়ের কারণে বেশিরভাগ মানুষই সেই প্রতিভাবে বিকশিত করতে পারে না।

বিশেষ করে গরিব বা মধ্যবিত্ত সমাজে সন্তানের বিশেষ প্রতিভাকে নেগেটিভ ভাবে দেখা হয়।  একটি ছেলে যদি ভালো ছবি আঁকে, গান গায়, অথবা তার অন্য কোনও ট্যালেন্ট থাকে – বাবা-মা জোর করে তার ভেতর থেকে সেই ট্যালেন্ট বিদায় করার চেষ্টা করেন।  কারণ তাঁদের মনে হয়, এসব করে কিছু হবে না।  তাঁরা চান তাঁদের সন্তান ভালোকরে পড়াশুনা করে একটি চাকরি জুটিয়ে নিক।

এই মানসিকতার পেছনে থাকে নিরাপত্তাহীনতার ভয়।  বড় কিছু করতে গেলে ঝুঁকি নিতে হয়।  ঝুঁকি যত বড়, সাফল্যও তত বড়।

রবার্ট কিওসাকি যখন তাঁর চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর নিজের বাবা অর্থা‌ৎ পুওর ড্যাড বিভিন্ন ভাবে ছেলেকে বিরত করার চেষ্টা করেছিলেন।  কিন্তু রবার্ট রিচ ড্যাডের পরামর্শমত ঝুঁকি নিয়েছিলেন, এবং এতটাই সফল হয়েছিলেন যা পুওর ড্যাড কল্পনাও করতে পারেননি। 

গরিব ও মধ্যবিত্ত মানসিকতার লোকেরা ঝুঁকি নিতে দারুন ভয় পান।  তাঁরা তাঁদের “কমফোর্ট জোন” বা নিরাপত্তা বলয় ছেড়ে বের হতে চান না।  তাঁদের সন্তানদেরও বের হতে দিতে চান না।  কারণ তাঁরা সব সময়ে নেগেটিভ ফলাফল নিয়ে বেশি চিন্তা করেন।  তাঁরা মনে করেন, মানুষ যতই চেষ্টা করুক, ভাগ্যে না থাকলে কিছুই হবে না।

অন্যদিকে, ধনীরা বিশ্বাস করেন, যদি কেউ চেষ্টা করে তবে ভাগ্যও তাকে সাহায্য করে।

অর্থা‌ৎ, গরিব বা মধ্যবিত্ত মানসিকতার মানুষজন যে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাকে ভয়ের কারণ হিসেবে দেখে, ধনী মানসিকতার মানুষেরা সেই একই বিষয়কে আশার উ‌ৎস হিসেবে দেখেন।

গরিব ও মধ্যবিত্ত মানসিকতার মানুষ পরিশ্রম করে টাকা রোজগার করার চিন্তা করে।

আর ধনী মানসিকতার মানুষ বুদ্ধি ও শ্রম দিয়ে টাকা সৃষ্টি করার চিন্তা করে।  তারা এমন উপায় বের করার চেষ্টা করে, যাতে নিজে না কাজ করেও টাকা আয় করা যায়।

লেখক এই অধ্যায়ে শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন।  যারা মনে করে শিক্ষা আসলে টাকা রোজগার করার উপায়, তারা কখনও টাকা সৃষ্টি করতে পারে না।  লেখকের মতে, শিক্ষা হচ্ছে জগতকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারার ও যে কোনও বিষয় নিয়ে গভীর চিন্তা করে সমাধান বের করার উপায়।

একজন শিক্ষিত মানুষ যদি তার শিক্ষাকে টাকা রোজগারের উপায়, অর্থা‌ৎ শিক্ষাকে একটি প্রোডাক্ট বানিয়ে ফেলে, তবে সেই শিক্ষার আসল ক্ষমতা সে ব্যবহার করতে পারবে না।

অন্যদিকে শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে যে মানুষটি সুযোগ চিনে নেয়ার, ও তাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করে – সে ধনী হয়ে ওঠে।

একজন মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ যদি সারাজীবন মার্কেটিং এর চাকরি বা সেই বিষয়ে শিক্ষকতাই করে যায় – তবে সে তার শিক্ষাকে বিক্রি করে সে শুধু টাকা রোজগারই করল, কিন্তু শিক্ষাকে ব্যবহার করে টাকা সৃষ্টি করতে পারলো না।

একই ভাবে একজন দারুন এ্যাকাউন্টেন্ট যদি সারাটা জীবন অন্যের অধীনেই কাজ করে যায়, তবে সে তার শিক্ষাকে নষ্ট করলো।  কারণ টাকা কিভাবে তৈরী হয়, সেটা এ্যাকাউন্টেন্টদের চেয়ে ভালো কেউ জানে না।

ধনীরা প্রথম জীবনে যে কাজই করুক, তার মাথায় থাকে সে এক সময়ে নিজেই টাকা বানাবে, মানে টাকার জন্য সে কারও ওপর নির্ভর করবে না। 

সে যে চাকরিই করুক, সেখান থেকে পাওয়া টাকার একটা অংশ সে সব সময়ে জমিয়ে রাখবে।  তারপর সুযোগ বুঝে বিনিয়োগ করবে।

রবার্ট কিওসাকি নিজেও প্রথম জীবনে বেশ কয়েকটি চাকরি করেছেন। শেষদিকে তিনি একটি ফটোকপি মেশিন কোম্পানীতে কাজ করতেন।  একটা সময়ে তাঁর দারুন আয় হতে শুরু করল।  সবাই বলাবলি করতে লাগলো, কোম্পানীতে তাঁর ভবিষ্য‌‌ৎ খুবই উজ্জ্বল।  কিন্তু রবার্ট যখন দেখলেন ব্যবসা করার যন্য তাঁর হাতে যথেষ্ঠ টাকা জমে গেছে, তিনি চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় নেমে পড়লেন।  কারণ তাঁর টার্গেট ছিল, টাকা সৃষ্টি করা, টাকা আয় করা নয়।

লিসন ০৬: টাকার জন্য কাজ করার বদলে শেখার জন্য কাজ করা কেন প্রয়োজন

এই অধ্যায়ে লেখক ধনী হওয়ার জন্য যেসব বিশেষ দক্ষতা অর্জন করতে হয় – সেই বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

যে কোনও শিক্ষা আর দক্ষতা দিয়েই টাকা আয় করে জীবন চালানো যায়, কিন্তু সত্যিকার ধনী হওয়ার জন্য কিছু বিশেষ দক্ষতা ও মানসিকতার প্রয়োজন।

লেখক এই অধ্যায়ে ইংরেজী সাহিত্যে মাস্টার্স শেষ করা এক তরুণীর উদাহরণ দিয়েছেন।  এই তরুণী পড়াশোনা শেষ করার পর একটি কোম্পানী থেকে সেলস এ কাজ করার অফার পায়।  তাকে সরাসরি ক্রেতাদের সাথে দেখা করে পন্য বিক্রয় করতে হবে।

এই অফার পেয়ে খুশি হওয়ার বদলে সে রীতিমত অপমান বোধ করে।  এত পড়াশুনা করে মানুষের কাছে গিয়ে প্রোডাক্ট বিক্রি করাটা তার জন্য যোগ্য কোনও কাজ বলে তার মনে হয়নি।

লেখক বলেন, এই ধরনের মানসিকতা থাকলে একজন মানুষ কখনওই ধনী হতে পারবে না।

আপনি যেভাবেই ধনী হতে চান না কেন, আপনাকে মানুষের সাথে যোগাযোগ করে তার কাছে নিজের আইডিয়া ও পন্য গ্রহণযোগ্য ভাবে তুলে ধরা শিখতেই হবে।

ধনীরা ইমোশনাল চিন্তার চেয়ে প্রাকটিক্যাল বা বাস্তবধর্মী চিন্তা বেশি করেন। 

একজন মধ্যবিত্ত যখন মনে করেন যে মানুষের কাছে গিয়ে পন্য বিক্রি করা তাঁর সামাজিক স্ট্যাটাসকে নিচে নামাবে; একজন ধনী মানসিকতার মানুষ চিন্তা করেন যে, আজ মানুষের কাছে গিয়ে পন্য বিক্রি করলেও, কাল আমি ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাব।

লেখক বলেন, আপনি যে বিষয়েই পড়াশুনা করেন না কেন, তার পাশাপাশি ম্যানেজমেন্ট, হিসাবরক্ষণ, অর্থ ব্যবস্থাপনা – ইত্যাদি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করুন।  সেই সাথে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন, সব ধরনের মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারার দক্ষতাকে।

তাঁর মতে, অনেক মানুষ প্রচুর জ্ঞান ও দক্ষতা থাকার পরও আর্থিক ভাবে বড় হতে পারেন না, কারণ কিভাবে টাকা বানাতে হয় – সেই ব্যাপারে তাঁদের জ্ঞান খুবই কম।

কিওসাকির মতে, যারা ধনী হতে চায়, তাদের সবারই উচি‌ৎ জীবনের প্রথমে টাকার জন্য কাজ না করে, টাকা বানাতে যেসব দক্ষতা লাগে, সেগুলো শেখার জন্য কাজ করা।

আপনি যত ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যত বড় ডিগ্রী নিয়েই বের হন না কেন, ধনী হতে চাইলে আপনাকে একদম নিচু স্তর থেকে কাজ শেখার জন্য তৈরী থাকতে হবে। 

আপনি যে চাকরি করছেন, সেখান থেকে ইনভেস্ট করার মত যথেষ্ঠ টাকা পাচ্ছেন না? আরেকটি ছোট কাজ করুন।  দরকার হলে ওয়েটার বা এই ধরনের কোনও কাজ বেছে নিন।

লেখক বোঝাতে চান, সব ধরনের মিথ্যা লজ্জা আর অহঙ্কার বাদ দিয়ে, যেটা যখন শেখা প্রয়োজন – সেটা শিখতে হবে।  তা না হলে, সারাজীবন অন্যের টাকা আর পেনশনের আশায় বসে থাকতে হবে।

ধনী হওয়ার পথে ৫টি মানসিক বাধা:

৬টি মূল লিসন বর্ণনা করার পর লেখক বইয়ে আরও কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।

লেখকের মতে ৫টি স্বভাব মানুষকে ধনী হওয়ার মত মানসিকতা গড়ে তুলতে বাধা দেয় : ভয়, আত্মবিশ্বাসের অভাব, আলস্য, বদ অভ্যাস, অহঙ্কার।

ভয়:

লেখক বলেন, ভয় মানুষের একটি স্বাভাবিক আবেগ।  সাহসীরাও ভয় পায়।  কিন্তু তারা ভয় পেলেও এগিয়ে যায়।  আর ভীতুরা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যায়।  বড় কিছু করতে গেলে ঝুঁকি থাকবেই, কিন্তু তার জন্য পিছিয়ে গেলে কোনওদিনই বড় কিছু করা হবে না।

আত্মবিশ্বাসের অভাব:

যেসব মানুষের আত্মবিশ্বাস নেই, তারাই নিজের ক্ষমতার ব্যাপারে সন্দেহ করে।  আপনি একটা কিছুর ব্যাপারে না-ই জানতে পারেন, কিন্তু শিখতে বাধা কোথায়? এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা কোনও একটি প্রোডাক্ট নিজেই খুব ভালো বানাতে পারেন, কিন্তু তবুও তাঁরা অন্যের অধীনে কাজ করেন।  এর কারণ তাঁরা আত্মবিশ্বাসী নন।

অনেকেই হয়তো এমনটা ভাবেন: “আমি প্রোডাক্ট বানাতে পারলেও, মার্কেটিং, ট্যাক্স – এসব তো বুঝি না”

এই ধরণের মানুষদের আসলে আত্মবিশ্বাসের অভাব।  মধ্যবিত্তদের মাঝে এই ধরনের মানসিকতা বেশি দেখা যায়।  একজন ধনী মানসিকতার মানুষ যদি দেখেন যে তিনি একটি প্রোডাক্ট বানাতে পারেন, তখন ব্যবসা করার জন্য অন্য যেসব জিনিস শেখার দরকার – সেগুলোও শিখতে শুরু করেন।  তাঁরা বিশ্বাস করেন, প্রয়োজনীয় সবকিছু শেখার মত ক্ষমতা তাঁদের আছে।

আলস্য:

লেখকের মতে, ধনী হওয়ার ৩য় মানসিক বাধাটি হলো আলস্য।  আলস্যের কারণে মানুষ পরিশ্রম করতে চায় না।  দক্ষতা থাকলেও সেই দক্ষতাকে কাজে লাগায় না।

হয়তো কারও যোগ্যতা আছে মাসে ৫০০০০ টাকা আয় করার কিন্তু আলস্যের কারণে সে মাত্র ২০০০০ টাকা আয় করে।

সেই সাথে অনেকেই আলস্যের কারণে, আজ করি-কাল করি করতে করতে নিজের ব্যবসা শুরুই করতে পারে না।

যার মাঝে ধনী হওয়ার সত্যিকার ইচ্ছা আছে, সে কখনও আলস্যকে প্রশ্রয় দেবে না।  যে কাজ যতটুকু করা দরকার, যখন করা দরকার – সেভাবেই কাজ করবে।  আজকের কাজ কালকের জন্য ফেলে রাখবে না। 

বদ অভ্যাস:

লেখকের মতে, ধনী হওয়ার পথে প্রধান আরেকটি মানসিক বাধা হলো বিভিন্ন ধরনের বদ অভ্যাস।  অনেকেই বদ অভ্যাসের কারণে আয় করা টাকা ঠিকমত কাজে লাগাতে পারে না।

একজন মানুষের যদি দিনে ১০০ টাকা বাজে খরচ হয়, মাসের শেষে তা ৩০০০ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়।  বেশিরভাগ মানুষই এভাবে নানান বাজে খরচে টাকা নষ্ট করে, এবং কাজের সময়ে টাকা হাতে থাকে না।

অহেতুক রেস্টুরেন্টে খাওয়া, অপ্রয়োজনীয় জিনিসের পেছনে টাকা খরচ করা – ইত্যাদি অভ্যাসের কারণে একজন মানুষ টাকা জমাতে পারে না, যে টাকা সে কোথাও বিনিয়োগ করতে পারতো।

টাকা নষ্ট করার বাইরে, দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা, কাজ ফেলে রাখা, রুটিন করে না চলা – ইত্যাদি অভ্যাসও মানুষের ধনী হওয়ার পথে বাধা দেয়।

নিজের চেষ্টায় ধনী হতে চাইলে সব ধরনের বাজে অভ্যাস দূর করতে হবে।

অহঙ্কার:

কথায় বলে, “অহঙ্কার পতনের মূল”।  রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড এর লেখক রবার্ট কিওসাকির মতে, অহঙ্কার শুধু পতনের মূলই নয়, অহঙ্কার মানুষকে ওপরেই উঠতে দেয় না।

৬ নং লিসনের সেই তরুণীর কথাই ধরা যাক, যে বড় একটি ডিগ্রী নিয়েছে বলে বিক্রয় কর্মী হিসেবে কাজ করতে চায়নি।  এর পেছনে রয়েছে অহঙ্কার।

নিজের চেষ্টায় ধনী হতে গেলে অনেক কিছু শিখতে হয়।  অনেক অভিজ্ঞতা নিতে হয়, এবং অনেক ধরনের মানুষের সাথে মিশতে জানতে হয়।

আপনার হয়তো একটি পি.এইচ.ডি আছে, কিন্তু একজন স্কুল পড়ুয়া ছাত্রও আপনাকে এমন কিছু শেখাতে পারে, যা সম্পর্কে আপনার কোনও ধারণাই ছিল না। 

যতক্ষণ না আপনি নিজের ভেতর থেকে সব ধরনের অহঙ্কার ঝেড়ে ফেলতে পারছেন, ততক্ষণ আপনি কিছু শিখতেও পারবেন না।  নিজের চেষ্টায় ধনী হতে চাইলে আপনাকে সব সময়ে শেখার চেষ্টা করতে হবে, সবার কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করতে হবে, এবং সব ধরনের মানুষের সাথে মিশতে জানতে হবে।


জনাব কিওসাকি তাঁর রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড বইতে যে ৫টি মানসিক বাধার কথা বলেছেন, এগুলো আসলে যারা সারা জীবন গরিব বা মধ্যবিত্ত থাকে – তাদের সাধারণ বৈশিষ্ট।  ধনী হতে হলে প্রথমেই এই জিনিসগুলো নিজের ভেতর থেকে বিদায় করতে হবে।

কিভাবে শুরু করবেন?

রবার্ট কিওসাকি তাঁর রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড বইতে ধনী মানুষদের উঁচু করে দেখাননি, অথবা গরিব ও মধ্যবিত্তদের নিচু করে দেখাননি।  তিনি শুধু মানসিক ও ব্যবহারিক পার্থক্য তুলে ধরেছেন, এবং নিজের মানসিকতা পরিবর্তন করার উপায় বলে দিয়েছেন।

শুধুমাত্র মানসিকতার কারণেই অনেক মানুষ একদম শূণ্য থেকে কোটিপতি হয়ে গেছেন।  এবং আপনি যে অবস্থাতেই থাকুন, চেষ্টা করলে আপনিও এসব মানসিকতা নিজের মাঝে নিয়ে আসতে পারবেন।

বইটিতে আসলে ধনী বলতে টাকা ওয়ালা মানুষ বোঝানো হয়নি, এখানে এমন মানুষ বোঝানো হয়েছে, যাঁদের মাঝে ধনী হওয়ার গুণগুলো আছে।

বইয়ে বর্ণনা করা রিচ ড্যাডও কিন্তু প্রথমে ধনী ছিলেন না, কিন্তু তাঁর মানসিকতা ছিল ধনী হওয়ার জন্য আদর্শ। এই মানসিকতা তিনি নিজের মাঝে সৃষ্টি করে নিয়েছিলেন। 

নিজের মাঝে ধনী হওয়ার মানসিকতা সৃষ্টির শুরুটা কিভাবে করবেন, সেই বিষয়ে বইয়ের শেষ দিকে লেখক কিছু টিপস দিয়েছেন:

০১. মোটিভেশন:

আপনাকে কেন ধনী হতে হবে? – এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজে বের করাটা ধনী হওয়ার মানসিকতা অর্জনের জন্য সবচেয়ে জরুরী।

শক্তিশালী মোটিভেশন বা অনুপ্রেরণা ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। 

লেখক বইতে লিখেছেন, পুওর ড্যাড নিজের সন্তানকে বলতেন, “তোমাদের জন্য আমি আজ গরিব হয়ে গেছি”, অন্যদিকে রিচ ড্যাড নিজের সন্তানকে বলতেন, “তোমাদের জন্য আমাকে ধনী হতে হবে”

দুইজনের পরিস্থিতি এক হলেও দু’জনের দৃষ্টিভঙ্গী সম্পূর্ণ আলাদা।  একজন পরিবারকে দেখছেন বাধা হিসেবে, আরেকজন দেখছেন অনুপ্রেরণা হিসেবে।

আপনাকেও এমন একটি অনুপ্রেরণা খুঁজে নিতে হবে।  আপনার অনুপ্রেরণা হতে পারে নিজের বাবা-মাকে সুখী করা, অথবা নিজের সন্তানের জন্য একটি প্রাচুর্যপূর্ণ ভবিষ্য‌ৎ গড়া।  পৃথিবীর অনেক বড় বড় ধনী মানুষ আছেন, যাঁরা নিজের কষ্ট সন্তানকে দিতে চান না বলে ধনী হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

যেটাই হোক, প্রথমেই আপনাকে একটি অনুপ্রেরণা দাঁড় করাতে হবে।

০২. মনকে শক্ত করা:

আপনি যখন ধনী হওয়ার চেষ্টা শুরু করবেন, তখন দেখবেন চারিদিক থেকে বহু মানুষ বহু কথা বলছে।  এমনকি আপনাকে নিয়ে তামাশাও করছে।  কিন্তু আপনার মনকে শক্ত রাখতে হবে।  যারা কারও ধনী হওয়ার ইচ্ছা নিয়ে তামাশা করে – তারা আসলে নিরাশ ধরনের মানুষ।  এরা নিজেরা চেষ্টা করে না, অন্যের চেষ্টার গুরুত্বও বোঝে না।

এছাড়া, সাময়িক ব্যর্থতা আসলেও হতাশ না হয়ে কাজ করে যাওয়ার মত মানসিকতা নিজের মাঝে রাখতে হবে।

সব সময়ে পজিটিভ চিন্তা করতে হবে।  সব সময়ে মনে রাখতে হবে, এখন সময় কঠিন হলেও, নিজের কাজ করে গেলে, একটা সময়ে সাফল্য আসবেই।

০৩. সঠিক বন্ধু নির্বাচন করুন:

আপনি কাদের সাথে চলছেন, তা আপনার ভবিষ্যতের ওপর দারুন প্রভাব ফেলে।

যখনই আপনি ধনী হওয়ার পথে চলার সিদ্ধান্ত নেবেন, তখন থেকেই এমন মানুষের সাথে চলার চেষ্টা করুন, যারা নিজেরাও ধনী হতে চায়।  আপনার চেয়ে বেশি জ্ঞানী ও দক্ষ মানুষের সাথে চলার চেষ্টা করুন, যাতে তাদের থেকে আপনি শিখতে পারেন, এবং আপনার উন্নতি হয়।  যারা ব্যবসা জগতের খোঁজ খবর রাখে, তাদের সাথে চলতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়।

০৪. পড়াশুনা করুন:

ধনী হতে হলে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান থাকা জরুরী।  বিশেষ করে আপনি যে প্রোডাক্ট বা সার্ভিসে বিনিয়োগ করছেন, এবং সেই সাথে ট্যাক্স, বানিজ্যিক আইন, নতুন প্রযুক্তি – ইত্যাদি বিষয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে হবে।

আপনার যদি ব্যবসা বিষয়ে পড়াশুনা না থাকে, তবে মার্কেটিং, এ্যাকাউন্টিং, বিনিয়োগ – ইত্যাদি বিষয় নিয়ে একে একে পড়াশুনা করতে হবে।  এই বিষয়গুলো না বুঝলে ব্যবসা বা বিনিয়োগ করাটা কঠিন।

০৫. কৃপণতা বাদ দিন:

টাকা পয়সা জমানোর মানে কিন্তু কৃপণ হয়ে যাওয়া নয়।  লেখক প্রয়োজনের জায়গায় যথেষ্ঠ টাকা খরচ করতে উ‌ৎসাহ দিয়েছেন।  এই অভ্যাস করতে পারলে আপনি বিনিয়োগ করতে ভয় পাবেন না।  ব্রোকারকে ভালো বকশিশ দিলে, পরে সে আপনার জন্য আরও ভালো ডিল নিয়ে আসবে।

০৬. আইডল রাখুন:

আপনি যে ক্ষেত্রেই সফল হতে চান না কেন, একজন মানুষকে আদর্শ ধরে নিলে আলাদা উ‌ৎসাহ পাওয়া যায়। সেই সাথে লক্ষ্য যত কঠিনই হোক না কেন, একটা অন্যরকম বিশ্বাস পাওয়া যায়। 

আপনার মত অবস্থা থেকে, বা আপনার চেয়েও খারাপ অবস্থা থেকে উঠে আসা কোনও মানুষকে আইডল ধরে এগুলে সব সময়ে একটা আত্মবিশ্বাস আপনার মাঝে বজায়ে থাকবে।  সব সময়ে মনে হবে, “তিনি পারলে, আমিও পারব”

শেষ কথা:

পুরো বইটিতে লেখক একটি বিষয় খুব ভালো করে বোঝাতে চেয়েছেন, ধনী হওয়ার আগে ধনী হওয়ার মানসিকতা অর্জন করা জরুরী।

মধ্যবিত্ত ও গরিব মানসিকতা ছেড়ে ধনী হওয়ার মানসিকতা নিজের মধ্যে আনতে পারলে, যে কারও পক্ষে ধনী হওয়া সম্ভব।

লেখক সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন, নিজের জন্য কাজ করার মানসিকতার ওপর।

অর্থের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর না করে যখন আপনি নিজেই নিজের জন্য অর্থ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নেবেন, তখনই বুঝতে হবে আপনি ধনী হওয়ার পথে রয়েছেন।

আর সেই পথে চলতে হলে কিভাবে নিজের মানসিকতাকে গড়ে তুলতে হবে, সেটাই লেখক এই বইয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

আর আমরা চেষ্টা করেছি, যতটা সংক্ষেপে পারা যায়, আপনার সামনে রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড বইটির মূল কথা তুলে ধরতে।

এই লেখা পড়ে বইটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে যদি আপনি একটি পরিস্কার ধারণা পান, তবেই আমাদের পরিশ্রম সার্থক।

সেই কাজে আমরা কতটা সফল হয়েছি তা অবশ্যই কমেন্ট করে আমাদের জানাবেন। 

আর যদি মনে হয় লেখাটি পড়ে অন্যরাও উপকৃত হবেন, তাহলে শেয়ার করে সবাইকে দেখার সুযোগ করে দিন। 

এই ধরনের আরও লেখার জন্য আমাদের সাথে থাকুন। সাফল্যের পথে, সব সময়ে, লড়াকু আপনার সাথে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *